ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে কি আর ‘রাইভালরি’ নেই? ভারতের টানা জয়ের পরিসংখ্যান কি বদলে দিচ্ছে ‘রাইভালরি’র সংজ্ঞা?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের ফলাফল দেখলে স্পষ্ট হয় একপেশে আধিপত্যের ছবি। বিশ্বকাপ থেকে এশিয়া কাপ—প্রায় সব বড় মঞ্চেই ভারতের ধারাবাহিক সাফল্য ‘রাইভালরি’ শব্দটির সংজ্ঞা নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ মানেই ছিল আবেগ, উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তার মিশেল। রাজনৈতিক ইতিহাস ও ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলিয়ে এই লড়াইকে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া-দ্বৈরথ বলা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতার ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে একদিকে ঝুঁকে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এশিয়া কাপ চলাকালীন এক সংবাদ সম্মেলনে Suryakumar Yadav মন্তব্য করেছিলেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচকে ‘রাইভালরি’ বলা নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত। তাঁর মন্তব্য আলোচনার জন্ম দিলেও, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তা নিয়ে বাস্তবসম্মত বিতর্কের সুযোগ করে দিয়েছে।
নিচে তথ্যভিত্তিক কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো, যা সাম্প্রতিক সময়ের চিত্র স্পষ্ট করে।
টানা জয়ে ভারতের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে!
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত পাকিস্তানের বিপক্ষে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে। সব ফরম্যাট মিলিয়ে শেষ আটটি সাক্ষাতে ভারত জয় পেয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ ও ওয়ানডে বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। পাকিস্তান শেষবার ভারতকে হারিয়েছিল ২০২২ সালের এশিয়া কাপে সুপার ফোর পর্বে। এরপর থেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিটি বড় ম্যাচেই ভারত জয়ী হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা শুধু এক-দুটি সিরিজের ফল নয়; একাধিক আইসিসি ও বহুজাতিক টুর্নামেন্ট জুড়ে বিস্তৃত। ধারাবাহিক জয়ের ফলে মানসিক চাপের দিক থেকেও ভারত স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষকের মত।
আরো পড়ুন: হ্যান্ডশেক বিতর্কের মাঝেই আক্রমকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলিতে মজলেন হিটম্যান
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মুখোমুখি: ৮–১ এগিয়ে ভারত!
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তানের লড়াই বরাবরই আলোচিত। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আসরের ফাইনাল থেকেই এই দ্বৈরথ বিশ্বমঞ্চে বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে ১৯ বছরের ইতিহাসে দুই দল মোট নয়বার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ভারত জয় পেয়েছে আটবার।
পাকিস্তানের একমাত্র জয়টি আসে ২০২১ সালের আসরে। সেই ম্যাচটি ঐতিহাসিক হলেও পরবর্তী সাক্ষাৎগুলোতে ভারত আবারও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ্বকাপের মতো উচ্চচাপের মঞ্চে এই পরিসংখ্যান দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের পার্থক্য তুলে ধরে।
সামগ্রিক টি-টোয়েন্টি পরিসংখ্যানেও একতরফা চিত্র!
শুধু আইসিসি টুর্নামেন্ট নয়, দ্বিপাক্ষিক ও এশিয়া কাপসহ সব নিয়ে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের রেকর্ডও ভারতের পক্ষে স্পষ্টভাবে ঝুঁকে আছে। মোট ১৭টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ভারত জয় পেয়েছে ১৪টিতে, পাকিস্তান জিতেছে মাত্র তিনবার।
এই ব্যবধান দেখায় যে সাফল্য কেবল বিশ্বকাপ-নির্ভর নয়, বিভিন্ন মঞ্চে ধারাবাহিক। ভারতীয় দলের ব্যাটিং গভীরতা, মধ্য ওভারে স্পিন আক্রমণের কার্যকারিতা এবং চাপের মুহূর্তে ম্যাচ শেষ করার দক্ষতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান কিছু ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।
আরো পড়ুন: সূর্য-ইশান জুটি আর বুমরাহ ম্যাজিক—হাইভোল্টেজ ম্যাচে নীল বাহিনীর দাপটে ধরাশায়ী পাকিস্তান!
ওয়ানডে বিশ্বকাপে পূর্ণ আধিপত্য!
ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারত–পাকিস্তান লড়াইয়ের ইতিহাস আরও স্পষ্ট। ১৯৯২ সালে প্রথম সাক্ষাতের পর থেকে দুই দল মোট আটবার মুখোমুখি হয়েছে এবং প্রতিবারই ভারত জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল ও ২০১১ সালের সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে টানা জয় শুধুমাত্র কৌশলগত প্রস্তুতির ফল নয়; মানসিক দৃঢ়তারও প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় ধরে একই ধারা বজায় রাখা যে কোনও দলের জন্য চ্যালেঞ্জিং, আর সেই জায়গাতেই ভারত এগিয়ে রয়েছে।
এবার ‘রাইভালরি’ শব্দটি কি নতুন সংজ্ঞা চাইছে?
ক্রিকেটে রাইভালরি সাধারণত বোঝায় দুই দলের মধ্যে সমানতালে লড়াই ও অনিশ্চয়তা। ইতিহাসের নিরিখে ভারত–পাকিস্তান অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক দ্বৈরথ। তবে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফলাফলের দিক থেকে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য অনেকটাই একপেশে হয়ে গেছে।
তবে এটাও সত্য যে, ক্রিকেটে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। এক প্রজন্মের আধিপত্য অন্য প্রজন্মে বদলে যেতে পারে। পাকিস্তান অতীতে বহুবার প্রত্যাবর্তনের নজির দেখিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ এখনও দর্শকসংখ্যা, সম্প্রচারমূল্য ও আবেগের দিক থেকে বিশ্ব ক্রিকেটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ফলাফলের বিচারে ভারত বর্তমানে স্পষ্টভাবে এগিয়ে।
তবে ‘রাইভালরি’ শব্দটি আবেগের দিক থেকে এখনও প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোই নির্ধারণ করবে—এই দ্বৈরথ আবার সমানে সমান হবে, নাকি বর্তমান ধারাই আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
Tags:






